বাবুল মুন্সী; প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে শিক্ষকশূন্যতা, দক্ষ শিক্ষকের অভাব, অবকাঠামো সমস্যা, ত্রুটিপূর্ণ নিয়োগ ব্যবস্থা, প্রচুর পরিমাণে শূন্যপদ ফাঁকা রয়ে যাওয়া সহ নানা কারণে এখনও অবহেলিত প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থা। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের খামখেয়ালিপনার কারণে এখনো এইসব সমস্যার সমাধানে উপযুক্ত কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়ার মতো না।

  • প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ২০১৮ সর্বোচ্চ সংখ্যক ২৪ লক্ষ পরীক্ষার্থী আবেদন করেন যার মধ্যে থেকে আমরা ৫৫,২৯৫ জন(২.৩%) পরীক্ষার্থী লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হই। অধিক পরিমাণে শূন্যপদ থাকার সত্ত্বেও ৫৫,২৯৫ জন থেকে মাত্র ১৮১৪৭ জন পরীক্ষার্থীকে চূড়ান্ত ভাবে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা হয়। আমরা বাকি ৩৭ হাজার মেধাবী শিক্ষার্থী নিয়োগ বঞ্চিত হই। লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েও আমরা চূড়ান্ত নিয়োগে সুপারিশ প্রাপ্ত হই নি। অথচ প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মো: ফসিউল্লাহ স্যার বলছেন, ভাইভাতে কোনো পাশ/ফেল নেই। উপস্থিত হলেই ১৪/১৫ নম্বর পাওয়া যায়। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাও বলেছিলেন, প্রাথমিকে ভাইভা পরীক্ষায় ফেল বলতে কিছুই নেই। তাহলে আমরা বাকি ৩৭ হাজার লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ চূড়ান্ত ভাবে সুপারিশ প্রাপ্ত না হওয়া পরীক্ষার্থী সবাই যোগ্য ও নিয়োগের দাবিদার।

নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির ৮ নং এ স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা আছে, শূন্যপদ পূরণের ভিত্তিতে প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়ার কথা কিন্তু চূড়ান্ত নিয়োগে সম্পূর্ণ শূন্যপদ পূরণ না করেই পদায়ন কার্যক্রম সম্পূর্ণ করা হয় যেটি ছিল নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির নিয়মের সাথে সাংঘর্ষিক । এছাড়াও সংবিধানের ২৯ নং অনুচ্ছেদ উল্লেখ করা আছে, প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োগ বা পদ-লাভের ক্ষেত্রে সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা থাকিবে। কিন্তু ২০১৪ সাল থেকে ২০২০ সালের মধ্যে আমরা মাত্র একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি পেয়েছি। অথচ ২০১৪ সালের আগে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর প্রতিবছর একটি করে সহকারী শিক্ষক নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করত। তাহলে ২০১৪ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত যেখানে ছয়টি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হওয়ার কথা সেখানে নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হয়েছে মাত্র একটি। তাহলে সংবিধানের ২৯ নং অনুচ্ছেদের উক্ত কথাটির কতটা যথাযথ প্রয়োগ করা হয়েছে সে ব্যাপারে প্রশ্ন থেকে যায়। দীর্ঘ ৬ বছর পর একটি মাত্র নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হওয়ায় আমাদের অনেক পরীক্ষার্থীর চাকরিতে প্রবেশের বয়স শেষ হয়ে গিয়েছে এবং যারা পরীক্ষায় অংশ গ্রহণের সুযোগ পায় বেশির ভাগেরই এটি ছিল শেষ চাকরির পরীক্ষা । ফলে প্রাথমিকে শিক্ষক হওয়ার যে স্বপ্নটা এতদিন ধরে লালন করে আসছিলাম সে স্বপ্নটা নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির দীর্ঘসূত্রিতার কারণে নষ্ট হয়ে গেল। প্রচুর পরিমাণে শূন্যপদ থাকার সত্বেও কেন শূন্যপদ পূরণ করা হচ্ছে না সেটিও অনেকটা প্রশ্নবিদ্ধ।

  • বর্তমানে প্রাথমিকে শূন্যপদ রয়েছে প্রায় অর্ধ লক্ষ। এছাড়াও নতুন পদে বর্তমানে ১ লাখ ৯৬৬ জন শিক্ষক পদ সৃজন প্রক্রিয়াধীন। সহকারী প্রধান শিক্ষক পদে ৬৫ হাজার শিক্ষক পদোন্নতি হলে ৬৫ হাজার সহকারি শিক্ষকের পদ শূন্য হবে। ৬৫ হাজার হিসাব রক্ষকের পদ সৃষ্টি হবে।

প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের সর্বশেষ বার্ষিক অগ্রগতি প্রতিবেদন ‘  বাংলাদেশ প্রাইমারি এডুকেশন অ্যানুয়াল সেক্টর পারফরম্যান্স রিপোর্ট ২০১৯’-এর তথ্য বলছে, মাত্র ১ জন শিক্ষকেই চলছে দেশের ৭৪৯ টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কার্যক্রম। ২ জন শিক্ষক দিয়ে শিক্ষা কার্যক্রম চালাচ্ছে—এমন বিদ্যালয়ের সংখ্যা ১ হাজার ১২৪ টি। আর ৩ জন শিক্ষকে পরিচালিত বিদ্যালয় রয়েছে ৪ হাজার ৮ টি।

  • সারাদেশের প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে চলমান শিক্ষক সংকটের কিছু চিত্র তুলে ধরা হল: কক্সবাজার জেলার চকরিয়া উপজেলায় অবস্থিত ৬২ নং নিদান তরানী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় । এখানে ছাত্র ছাত্রী রয়েছে ৫ শতেরও অধিক। শিক্ষক রয়েছে ৩ জন। প্রধান শিক্ষক নেই, ১ জন সহকারী শিক্ষিকা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকার হিসাবে দায়িত্ব পালন করে। ফাঁকা রয়ে গেছে ২ জন শিক্ষকের পদ।

নোয়াখালী জেলার সেনবাগ উপজেলার এনায়েতপুরে অবস্থিত এনায়েতপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ বিদ্যালয়ের মোট শিক্ষকের পদ রয়েছে ৭ টি। বর্তমানে কর্মরত রয়েছেন মাত্র ৩ জন শিক্ষক যার মধ্যে ১ জন ভারপ্রাপ্ত নারী প্রধান শিক্ষিকা ও বাকি ২ জন সহকারী শিক্ষক, শিক্ষিকা। ফলে ফাঁকা রয়ে গেছে আরও ৪ টি শূন্যপদ। বিদ্যালয়টির মোট শিক্ষার্থী রয়েছে ১০৪ জন।

  • পটুয়াখালী জেলার দুমকি উপজেলায় পাঙ্গাংশিয়া ইউনিয়নে ৯ নং পাংঙ্গাশিয়া মুস্তাফিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকের পদ রয়েছে মোট ৬ টি। বর্তমানে কর্মরত আছেন ১ জন প্রধান শিক্ষক ও ২ জন সহকারী শিক্ষক। বাকি ৩ টি সহকারী শিক্ষকের পদ শূন্য রয়ে গেছে। যার মধ্যে ১ জন সহকারী শিক্ষক যিনি পিটিআই প্রশিক্ষণে আছেন বাকি ১ জন নারী সহকারী শিক্ষিকা আছেন তিনিও মাতৃত্বকালীন ছুটি নিতে চলে যাওয়ার কথা থাকলেও এখনও বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। ফলে মাত্র ১ জন সহকারী শিক্ষিকা দিয়ে বিদ্যালয়ের সমস্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে ।
    কুমিল্লা জেলার অধীন মেঘনা উপজেলার ৩৫ নং বাঘাইকান্দি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষকের পদ রয়েছে ৬ টি। কিন্তু বিদ্যালয়ে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ২ জন সহকারী শিক্ষক। ফাঁকা রয়ে গেছে ৪ জন শিক্ষকের পদ। এই ২ জন শিক্ষকেই চলছে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম ও অন্যান্য প্রশাসনিক দায়িত্ব।

সিরাজগঞ্জের কাজিপুর উপজেলার ১২ টি ইউনিয়ন রয়েছে তার মধ্যে ৬ টি ইউনিয়ন দূর্গম চরাঞ্চলে। চরাঞ্চলে প্রায় ১২০ টি প্রাথমিক বিদ্যালয় আছে। চর আদিত্যপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ৬ টি পদ আছে, কিন্তু কর্মরত শিক্ষক আছেন মাত্র ৩ জন। শুধু এই চরআদিত্য স্কুলই না, বরং কাজিপুর উপজেলার চরাঞ্চলের প্রত্যেকটা স্কুলে ২ টি, ৩ টি এমনকি ৪ টি পর্যন্ত পদ ফাঁকা আছে।

  • খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষক সংকট কমবেশি সারা দেশেই রয়েছে। তবে চর ও হাওড় অঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে এ সংকট প্রকট। অনুন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থার কারণে এসব বিদ্যালয়ে পদায়ন নিতে চান না শিক্ষকরা। নিয়োগের সময় অনেককে এসব প্রত্যন্ত এলাকায় পদায়ন দেয়া হলেও পরবর্তী সময়ে বদলি হয়ে চলে যান অন্য বিদ্যালয়ে। এর ফলে বছরের পর বছর শিক্ষকের সংকটের মধ্য দিয়ে যেতে হয় এসব বিদ্যালয়কে। এতে করে সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের পাঠদানও মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়।

তাই প্রাথমিক বিদ্যালয় গুলোতে বিদ্যমান শূন্যপদ পূরন, চলমান শিক্ষক সংকট দূরীকরণ ও করোনা পরবর্তী শিক্ষার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে প্যানেলে নিয়োগের কোনো বিকল্প নেই।

  • মানবতার মা জননেত্রী শেখ হাসিনা নিশ্চয়ই প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ২০১৮ লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ৩৭ হাজার মেধাবী প্যানেল প্রত্যাশীদের দুঃখ-কষ্ট বুঝবেন এবং মুজিব বর্ষে প্যানেল নিয়ম প্রবর্তন করে ৩৭ হাজার প্যানেল প্রত্যাশীদের নিয়োগের ব্যবস্থা করে দিবেন।

লেখক,  প্রাথমিক সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষা ২০১৮ প্যানেল প্রত্যাশী কেন্দ্রীয় কমিটি ।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।