Shadow

‘ভিখারিনী’

শেয়ার করুনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

ইশরাত জাহান রোজী

সামনে রোজা। মাত্র দিন দশেক পরেই। তারপর ঈদ। ঈদের তেমন বিশেষ কিছু কেনাকাটা নেই। তবু কিছু টুকিটাকি কেনার উদ্দেশ্যেই স্বামীর সাপ্তাহিক অফিস ছুটির দিনে বিকেলে রুবি ওর স্বামীকে নিয়ে বাজারে যায়।

বাজারে একলা কেনাকাটার অভ্যাস নেই তার। তাই, যা কিছুই লাগুক না কেন স্বামীকে সাথে নিয়েই যায়। এতে অবশ্য এক ঢিলে দুই পাখি মারা হয়। কেনাকাটাও হয়, আবার দুজনের একসাথে কিছু সময়ও কাটানো হয়। আসলে ওদের একসাথে নিজেদের মতো করে সময় কাটানোও তো হয় না বললেই চলে। তাই একটু সময়ই যেন ওদের কাছে অনেক বড় পাওয়া।

রুবির স্বামী মাহমুদ, সকাল সাতটায় অফিসের উদ্দেশ্যে বাসা থেকে বের হয়। আর যখন বাসায় ফিরে তখন রাত প্রায় নয়টা। এরপর রাতের খাবার খাওয়া, ছেলে-মেয়ের খোঁজ খবর নেওয়া, বিশ্রাম নেওয়া, একটু টিভি দেখা আর তারপরই ক্লান্ত শরীরে ঘুম। ক্লান্ত মানুষটার সাথে তখন দু’কথা বলতেও যেন মায়া লাগে তার। তাই প্রয়োজন ছাড়া বাড়তি কথা আর বলে না রুবি তখন। এভাবেই ব্যস্ততা আর বাস্তবতার মাঝেই দিন-রাত কেটে যায় ওদের।

এ দোকান ও দোকান ঘুরে ঘুরে বাজারে পছন্দমতো প্রয়োজনীয় টুকিটাকি কেনাকাটা করে ওরা। অনেক বাঁচিয়ে চলার পরেও বাজারে মানুষের ভীড়ে অনিচ্ছায় ধাক্কা লাগে গায়ে। কখনো দুঃখিত শব্দটা বলতে বাধ্য হতে হয়, কখনো অন্যরা বলে উঠে।

দোকানীর সাথে ক্রেতার জিনিসপত্রের দামদরের কথোপকথন রুবির খুব ভালো লাগে দেখতে। বাজারে গেলে এ বিষয়টা ওকে খুব মজা দেয়। মাঝেমধ্যেই ও আনমনা হয়ে এসব খেয়াল করে সবার অগোচরে। কখনো দোকানীকে বোকা মনে হয়, কখনো ক্রেতাকে। রুবি তখন কেবলমাত্র মজা লুটিয়ে নেওয়া দর্শক-শ্রোতা।

আজও তেমন দু’একটা চিত্র যে নজরে পড়েনি তা নয়। দেখে আপন মনে হেসেছেও রুবি। এক সময় কেনাকাটা শেষে বাসায় ফেরার পালা আসে। রিক্সা ভাড়া নেয় দামাদামি করে। রুবি ও মাহমুদ রিকসায় উঠে বসে। তখন সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত নেমেছে শহরে। নিয়ন বাতির আলোয় রাস্তা, দোকানপাট, রাস্তার পাশে উঁচু উঁচু দালান সবই আলোকিত। সেই আলোকিত শহরের পিচ ঢালা ব্যস্ত রাস্তায় ওরা এগিয়ে যায় গন্তব্যের পথে।

ওরা যে রিক্সায় উঠেছে, সেই রিক্সাচালক মধ্যবয়সী। লম্বা শরীর, কিন্তু স্বাস্থ্য কম। মাহমুদ রিক্সাচালকের সাথে কথা বলতে শুরু করে।
— আপনার বাড়ি কই চাচা?
— বাড়ি তো বাজান ফরিদপুর।
–এখানে কই থাকেন?
–মাতবর বাড়ির সাইডের বস্তি’ত থাহি বাজান।
–সংসার আছে চাচা?
–হ’ বাজান। তুমার চাচী মাইনষ্যের বাড়িত কাম করে। দুই পোলা, দুই মাইয়্যা। মাইয়্যা একটা বিয়া দিচি। আর একটা রইচে।
— ভালো। ছেলেরা কি করে? ছোট না বড়?
–দুই পোলা আর ছোট মাইয়্যা পড়তাছে। পোলা দুইডার একটা কলেজ পাশ দিল আর একটা ইস্কুলে মেট্রিক পরীক্ষা দিব এইবারে।
আর ছোট মাইয়্যা কিলাস এইটে বাজান।
–খুবই ভালো তো চাচা।

রুবি চুপচাপ মাহমুদের সাথে রিক্সাচালকের কথোপকথন শুনতে থাকে। ভালো লাগে ওর এসব মেহনতি মানুষের আগামী দিনের স্বপ্ন জয়ের গল্প শুনতে। একদিন হয়ত এই ঘাম ঝরিয়ে রোজগার করা মানুষটাও তার সন্তানদের কাছে একজন সফল বাবা হয়ে উঠবেন। তখন এই কষ্টের দিনগুলোর অনুভূতি হারিয়ে যাবে। সেখানে জন্ম হবে নতুন এক সুখের ধারাবাহিক গল্প।

রুবি লক্ষ্য করে, ওরা প্রায় চলে এসেছে। বাসায় থাকা ছেলে-মেয়ের কথা মনে পড়তেই মাহমুদকে বলে,
–” অপু আর নিশি বাসায়। ওদের জন্য কিছু খাবার নাও।”
— কি নিব?
–নাও কিছু একটা। তোমার যা ইচ্ছে।
–নানরুটি আর চিকেন নিব?
–নাও, তাহলে একেবারেই ডিনারও হয়ে যাবে।
–তোমার রান্নার ঝামেলা আর করতে হবে না। বেঁচে যাবে তাতে।
রুবি হেসে উঠে মাহমুদের কথায়। মাহমুদ জানে, রুবি সাংসারিক কাজের ব্যাপারে একটু অলস। বিশেষ করে রান্নার ব্যাপারে আরও। তাই বাহির থেকে খাবার আনিয়ে কোনো একবেলা কাটিয়ে দিতে পারলে যেন অনেক কষ্ট থেকে বেঁচে যায় ও।

সামনেই রাস্তার পাশে একটা রেস্টুরেন্ট দেখে রিক্সাটা থামাতে বলে মাহমুদ। রিক্সা থামলে, মাহমুদ নেমে রেস্টুরেন্টের ভিতরে ঢুকে যায়। রুবিও রিক্সা থেকে নামে।

অনেকক্ষণ রিক্সায় বসে থেকে, আর টুকিটাকি জিনিসপত্রের ব্যাগগুলো হাতে ধরে থেকে হাঁপিয়ে গেছে। ব্যাগগুলোকে রিক্সায় পা রাখার জায়গায় রেখে সাবধানে রিক্সা থেকে নামে রুবি, যাতে নামতে গিয়ে শাড়িটা রিক্সায় লেগে ছিঁড়ে না যায়। মাহমুদের সাথে বাজারে বের হলে বেশিরভাগ শাড়িই পড়ে রুবি। রুবিকে শাড়ি পরে দেখতে পছন্দ করে মাহমুদ। রুবিও সুযোগটা হাতছাড়া করে না। প্রিয় জীবনসঙ্গীর চোখে নিজেকে মুগ্ধ করে রাখতে প্রানবন্ত চেষ্টা করে।

রিক্সা থেকে নেমে রাস্তায় মানুষের ব্যস্ততা দেখতে রুবির চোখও ব্যস্ত হয়ে উঠে। রেস্টুরেন্টের সামনে মানুষের খাবার নেবার ও খাবার খাওয়ার ব্যস্ততা, রাস্তায় কিছু মানুষের প্রিয় মানুষের কাছে ঘরে ফেরার ব্যস্ততা! এসবই দেখছিল রুবি।

হঠাৎ ওর প্রায় কাছাকাছি তিন হাত দুরত্বে একজন ভিখারিনীকে দেখতে পায়। আর সাথে সাথেই রুবির চোখ-মুখে অন্য রকম একটা কিছু ফুটে উঠে। ভিখারিনীর উস্কো-খুস্কো তেলহীন চুল, পরনে ধূসর রঙের ময়লা শাড়ি। হাতে সাদা আর নীল রঙের দুটো পলিথিন ব্যাগ। স্বচ্ছ পলিথিন ব্যাগ, তবুও রুবি ঠিক বুঝতে পারে না তাতে কী আছে! রুবি সেদিকে মনোযোগও দেয় না।
খয়ের-জর্দা দিয়ে পান খাওয়া দাঁতগুলো কালো আর লালচে মিলে অন্য রকম একটা রঙ ধারণ করেছে। ক্ষয় হয়ে যাওয়া দাঁতগুলো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে রুবি। কারণ, ভিখারিনীটি রুবির দিকে তাকিয়ে হাসছে। তারমানে, রুবিকে চিনতে পেরেছে।

  'হেমন্তে'র আগমনে'

রুবির বুকের ভিতরটায় কি যেন একটা দলা পাকিয়ে উঠে। খুব সন্তর্পনে নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে হেসে জিজ্ঞেস করে,”কেমন আছ?”
“ভালা আফা। আফনি ভাআলা আচেন?” -খুব টেনে টেনে কথাটুকু উচ্চারণ করে ভিখারিনীটি। মুখে লেগে থাকে হাসিটা। কিন্তু রুবির বুক ভেঙে কেবলই কান্না আসে। রাস্তায় সবার সামনে একজন ভিখারিনীকে দেখে কাঁদাটা হাস্যকর, তাই কান্না চেপে রাখে। ভিখারিনীর মুখের দিকে তাকিয়ে খুব ইচ্ছে করে তাকে বুকে জড়িয়ে ধরতে। কিন্তু, পারে না।
বাস্তবতা শব্দটা কত মানুষের কত ইচ্ছেকেই নিয়ন্ত্রণ করে। মানুষ হেরে যায়। বাস্তবতা জয়ী হয়। রুবির ইচ্ছে করে ভিখারিনীকে কিছু টাকা দিতে। মাহমুদ তখনো রেস্টুরেন্টের ভিতর থেকে আসেনি। হাতের পার্স খুঁজে মাত্র একশ টাকা পায়। অগত্যা সেই টাকাটাই ভিখারিনীর হাতে দিয়ে বলে,

–নাও। এদিকে কই থাকো?

হাত বাড়িয়ে টাকাটা নেয়। চোখে-মুখে অবাক করা খুশি। হাতে টাকা ধরে রেখেই আঙুল সামনের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে জবাব দেয়, ” ঐ দিকে থাহি আফা। ”
সাথে আরও কিছু বলে, কিন্তু অস্পষ্ট কথাগুলো বুঝতে পারে না রুবি। কিংবা ওর মন তখন অন্যদিকে।

এরই মধ্যে মাহমুদ চলে আসে রুবির কাছে। রুবি মাহমুদের দিকে তাকিয়ে ভিখারিনীকে দেখিয়ে বলে, “দেখো, সেই ভিক্ষুকটা!”
বলতে বলতে রুবি বুঝতে পারে, ওর আবারও কান্না পাচ্ছে।
মাহমুদ তাকিয়ে দেখে। সেও চিনতে পারে। কিন্তু কিছু বলে না। কিন্তু আর দেরি না করে রুবির উদ্দেশ্যে বলে,
–চলো, দেরি হয়ে যাচ্ছে।
–হ্যাঁ, চলো

ভিখারিনী সামনে এগিয়ে যায়। হাতে রুবির দেওয়া একশ টাকার নোট। মুখে নিস্পাপ, নির্মল হাসি। যেতে যেতে একবার পিছন ফিরে তাকায়। রুবিদের রিক্সা তখন উল্টো রাস্তায় চলা শুরু করেছে।

রুবির মন ভারাক্রান্ত। বার বার কান্না দলা পাকিয়ে গলার কাছে এসে আটকে যাচ্ছে। মাহমুদ আবারও রিক্সাওয়ালার সাথে গল্প শুরু করেছে। কিন্তু এবার রুবির মন আর ওদিকে নেই। ওদের কোনো কথা আর ওর কানে পৌঁছায় না। ও তখন অন্য কথা ভাবে।

পাঁচ কি ছয় বছর আগে, দরজায় কোনো এক ভিখারিনীর ডাক শুনে দরজা খুলে দিয়েছিল রুবি। হাতে একটা ছোট বাটিতে চাল,ভিখারিনীকে দেওয়ার জন্য। কিন্তু চাল দিতে গিয়ে একদম অবাক হয়ে চেয়ে থাকে রুবি সেই ভিখারিনীর দিকে। ওর মায়ের চেহারার সাথে অনেক মিল খুঁজে পায়। ফর্সা একই রকম, উচ্চতাও প্রায় একই। বিশেষ করে মুখটা!

রুবি তো সেই পনেরো বছর আগেই ওর মাকে হারিয়েছে। তাই মায়ের মতো চেহারার ভিখারিনীকে দেখে চমকে যায়। একটু মায়াও হয়। প্রতি সপ্তাহে আসত ভিখারিনীটি। রুবিও মায়ার বশে এটা-সেটা দিত। দিনে দিনে ভিখারিনীর আশাও বাড়তে থাকে।
তেমনই একদিন দুপুরে, ভিখারিনীটি এসেছিল বৃষ্টিতে ভিজে ওর দরজার কড়া নেড়েছিল। রুবির মন সেদিন কোনো এক কারণে ভালো ছিল না। ভিখারিনীটি একটা পুরানো শাড়ি চেয়েছিল। রুবি রেগে গিয়েছিল খুব। শাড়ি তো দেয়নি, আরও দরজায় বসে থাকা ক্লান্ত ভিখারিনীর সামনেই দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছিল।

পরে রুবি নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিল। রাতে ঘুমাতে পারেনি সেদিন। এপাশ-ওপাশ করেই রাত কাটিয়েছিল। অপরাধবোধের যন্ত্রণা ওকে আঁকড়ে ধরেছিল।
তারপরের সপ্তাহে যখন এসেছিল তখন প্রায় নতুন একটা শাড়ি দিয়েছিল। শাড়িটা দিতে পেরে কী যে শান্তি পেয়েছিল রুবি! সাথে অপরাধবোধের বোঝাটুকুও সরে গিয়েছিল মাথা থেকে।

এভাবেই চলছিল। আস্তে আস্তে ভিখারিনীটিকে আর দেখতে পেত না। আসত না আর। অনেক দিন হলো আর আসেনি। তাই রুবি প্রায় ভুলেই গিয়েছিল তাকে। আজ দেখল কয়েক বছর পর। ভিখারিনীটি সম্ভবত ভারসাম্যহীন। কথাতেও আড়ষ্টতা। তবুও সব কিছুকে ছাপিয়ে ভিখারিনীটি রুবির হৃদয়ে এক অসামান্য জায়গা দখল করে নিয়েছে।
মায়ের মতো চেহারা বলেই তাকে দেখে মৃত মায়ের কথা খুব মনে পড়ে। মায়ের অভাবটা অনুভব করে মনের গভীর থেকে।

বাকি রাস্তাটুকু আর কোনো কথা বলতে পারে না রুবি। প্রাণপনে ভিতরের আবেগ আর কষ্টটা সামলিয়ে রাখে সে। ও জানে, এ আবেগ নিয়ে থাকলে ওর চলবে না। ওকে বাস্তবতায় ফিরতে হবে।

রিক্সা ঠিক সময়ে বাসার গেটে পৌঁছায়। ব্যাগগুলো হাতে নিয়ে তিন তলায় উঠে। রিক্সার ভাড়া মিটিয়ে পিছন পিছন মাহমুদও আসে। বাসায় পৌঁছালে ছেলে-মেয়ে দুজন ছুটে কাছে আসে। ব্যাগগুলো ছিনিয়ে নেয় হাত থেকে। কী কী কেনাকাটা হয়েছে,তা দেখতেই ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
রুবি কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখে। তারপর একটা বড় দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্যদিকে চলে যায় নিজেকে আড়াল করতে।

শেয়ার করুনঃ
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  
  •  

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *