বহ্নিশিখা জামালী; পৃথিবীর কোন শক্তি যা পারেনি অদৃশ্য এক ভাইরাস কোভিড- ১৯ পৃথিবীব্যাপী মানুষের জীবন ও জীবিকা সবকিছুকে তছনছ করে দিয়েছে। আমাদের সকল দম্ভকে ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছে। ঘরবন্দী করেছে কোটি মানুষকে। অদৃশ্য এই জীবানু স্কুল, কলেজ, অফিস, আদালত, কলকারখানা, হাটবাজার, গণপরিবহন, সভা, সমাবেশ, সামাজিক মেলামেশা সবকিছু বন্ধ করে দিয়ে ঘরে থাকতে বাধ্য করেছে পৃথিবীর কোটি কোটি মানুষকে। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সাময়িক ভাবে ‘লকডাউন’ করতে হয়েছে। পারিবারিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডসহ মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের অবাধ চলাচল, মেলামেশা সবকিছু আজ অবরুদ্ধ, স্তব্ধ ও বিপর্যস্ত। গেল ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস, নববর্ষ, মেহনতি মানুষের কাঙ্খিত শ্রমিক দিবস সবকিছু পার হলো একেবারে অনাডম্বর ও বর্নহীনভাবে।
এক মাস সিয়াম সাধনার পর রমজানের রোজার শেষে বিপুল আনন্দ নিয়ে বাঙালি মুসলমানের জীবনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে প্রতি বছর যে ঈদ আসে সেই ঈদও চলে গেল নিরানন্দভাবে। ঈদ খুশীর বারতার বিপরীতে এক রাশ বিষন্নতা ও বিষাদের ছায়া হিসাবে ধরা দিল। ঈদের আয়োজনের চেনা ছবিগুলো এবং চেনা গল্প সবই কেমন যেন অচেনা হয়ে গেল। করোনা সংক্রমণ থেকে দূরে থাকতে যেসব নির্দেশনা ও পরামর্শ মানুষকে নিরাপদে থাকার জন্য আরোপ করা হয়েছিল তাতে ঈদের আনন্দ উদযাপন অনেকখানি ম্লান হয়ে গিয়েছিল। স্মরণকালে এই প্রথম করোনা বিস্তার রোধে জাতীয় ঈদগাহে ঈদের জামাতের আয়োজন নেই। স্বাস্থ্যবিধি মেনে কোলাকুলি ও হাত মেলানো নেই। ঈদ উপলক্ষে বিপনী বিতানে লাখো মানুষের ভিড়, শিশু পার্ক, চিড়িয়াখানা, বিনোদন কেন্দ্র সরব হয়নি। সাজানো রঙিন নিয়নবাতির আলোয় সাজ সজ্জায় ঝলমলিয়ে ওঠেনি সড়ক ও সরকারি বাসভবনগুলো। স্যাটেলাইট টিভি চ্যানেলগুলো ঈদের নতুন বিশেষ কোন অনুষ্ঠানমালা নিয়ে উপস্থিত হয়নি। করনা’র কারণে নাটক, সিনেমার শ্যুটিং বন্ধ। করোনা আতঙ্কে শারীরিক দুরত্ব বজায় রাখতে গিয়ে আমরা ক্রমেই যেন পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি। আর কোন ভাইরাস আমাদের পরস্পরকে এমনি করে বিচ্ছিন্ন করতে পেরেছে কিনা বলা মুশকিল। অবরুদ্ধ জীবনের এইসব বিচ্ছিন্নতা শারীরিক দূরত্ব বাড়িয়ে তোলার পাশাপাশি মানসিক দূরত্ব সৃষ্টি করে নানা ধরনের ট্রমারও জন্ম দিয়েছে। এক বিরাট অংশের মধ্যে তৈরী হচ্ছে নৈরাশ্য ও হতাশা। করোনার অদৃশ্য ছোবলে দীর্ঘ ছুটির অন্তরালে স্বেচ্ছামূলক নির্বাসন যেন বাহ্যিক লকডাউনের সাথে মনেরও লকডাউন করে দিয়ে গেছে।
পৃথিবীর নানা দেশের মত জাতীয় জীবনে আমরা এক বিষাদময় দুঃসময় অতিক্রম করছি। প্রতিদিন করোনা মহামারিতে মৃত্যুর তালিকা ও লাশের সারি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। করোনা সংক্রমনের সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে। পরিবারের কে কখন আক্রান্ত হয় এই নিয়ে প্রবল ভয়ভীতি ও শঙ্কা বিরাজ করছে। অনেক চেনা মানুষ, বন্ধু, স্বজন, নিটক আত্মীয়দের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার দুঃসংবাদও শুনতে হচ্ছে। প্রতিদিন, প্রতিমুহুর্ত গভীর উদ্বেগ-উৎকন্ঠা নিয়ে পার করতে হচ্ছে। এ অবস্থার অবসান কিভাবে হবে কেউই নিশ্চিত জানে না।
একদিকে করোনার বিরুদ্ধে লড়াই আর অন্যদিকে কর্মহীন, খাদ্যহীন, বেকার জীবনের হাহুতাশ কোটি কোটি মানুষকে চরম বিপন্ন অবস্থায় ফেলে দিয়ছে। দুই মাস করোনার কারণে সবকিছু বন্ধ থাকার ফলে নিম্নআয়ের বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের মধ্যে দেখা দিয়েছে জীবন ও জীবিকার সংকট ও অসহায়ত্ব। গ্রামগঞ্জ, শহর-উপশহর, পাড়া-মহল্লা, রাস্তা, ফুটপাতে কোন জনসমাগম নেই। হোটেল, রেস্তোরা, দোকানপাট সব বন্ধ। সবখানে ক্রেতা শূন্যতা। বিকিকিনি নেই। সব যেন খাঁ খাঁ করছে। কর্মমুখী গণ জোয়ারের সরব উপস্থিতি নেই। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, রিকসাওয়ালা, গার্মেন্ট কর্মী, পরিবহন শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, তাঁতী যাদের দিয়ে সমগ্র বাংলাদেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে তাদের অনুপস্থিতি বেশী বেশী চোখে পড়ে। অথচ এসব মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগে সমাজের দুর্বৃত্তরা খাদ্য সামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধিতে তৎপর হয়।
গরীবের খাদ্য ও ত্রাণ নিয়ে চুরি, দুর্নীতি, দলীয়করণ ও জালিয়াতি এই দুঃখ কষ্টকে আরো বাড়িয়ে তুলেছে।
দক্ষিণাঞ্চলের উপকুলীয় জেলাসমূহে সাম্প্রতিক ঘুর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস লক্ষ লক্ষ মানুষের দুর্ভোগ ও দুর্গতিকে আরো শোচনীয় করে তুলেছে । এ যেন ‘মরার উপর খাড়ার ঘা’। এই ঝড়-জলোচ্ছাস উপকুলীয় জনপদকে লন্ডভন্ড করে দিয়ে গেল। প্লাবিত করলো হাজার হাজার এক ফসলি জমি, খেতের ফসল, মৎস্য খামার, বিস্তির্ণ গ্রামাঞ্চল, ধসে পড়লো ঘরবাড়ি, বসতভিটা, ভেসে গেল ঘেরের মাছ। সুরক্ষা বাঁধও পানির তোড়ে উড়ে গেল। বহু গ্রাম প্লাবিত হওয়ায় অনেকের গরু-ছাগল, হাঁস-মুরগী ভেসে গেল। লক্ষাধিক মানুষ এখন গৃহহীন-আশ্রয়হীন। আম্পানের আঘাতে সবকিছু হারিয়ে মানুষ এখন বিপর্যস্ত ও দিশেহারা।
এরপরও মানুষ লড়ছে। ঘুর্ণিঝড় আর জলোচ্ছ্বাসের তান্ডবের কাছে আমাদের মানুষ আগে যেমন আত্মসমর্পণ করেনি, এবারও মানুষ আত্মসমর্পণ করবেনা। সাতক্ষীরার কয়রায় বাঁধ ভেঙে যাবার পর ঈদের দিন ভোর থেকে হাজার হাজার মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে পানির মধ্যে নেমে যেভাবে বাঁধ নির্মাণ করছে তা এক অসাধারণ ঘটনা। সরকারের আমলাতান্ত্রিক উদ্যোগের দিকে না তাকিয়ে মানুষ যেভাবে পারস্পরিক সহযোগিতা নিয়ে বাঁধ তৈরীর মধ্য দিয়ে নিজেদের জন্য নিরাপদ বেষ্টনী তৈরী করছে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের কাছে হার না মানা এই অদম্য মানুষেরাই বাংলাদেশের প্রাণ এবং তার আসল শক্তি। নিকট অতীতেও সিডর, আইলা, বুলবুল, ফনি’র মত বিভিন্ন ঝড জলোচ্ছাসের পর মানুষ এভাবে গণউদ্যোগের মধ্য দিয়ে বারবার মরতে মরতে উঠে দাঁডিয়েছে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই মানুষের কর্মউদ্যোগ ও সৃজনশীরতাকে আমাদের রাষ্ট্র ও সরকার যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারেনি; কখনো তাদের যথাযথ মূল্যায়ন করেনি।
সুন্দরবন আরো একবার মায়ের মত বুক আগলে এই বড় ঝঞ্জা থেকে উপকুলীয় মানুষকে রক্ষা করেছে। সুন্দরবন ঝড়ের গতি ৭০ কি.মি কমিয়ে দিয়েছে। জলোচ্ছাসের উচ্চতা কমিয়ে দিয়েছে তিন থেকে চার ফুট। বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চল জুড়ে সুন্দরবনের বিশাল নিরাপত্তা বেষ্টনী বাংলাদেশ ও দেশের মানুষের অস্তিত্বের সাথে একাকার হয়ে আছে। চোখের মনির মত যত্ন করে এই বন ও বনাঞ্চলকে আমাদের রক্ষা করতে হবে। এবার ঝড় আম্পান আমাদেরকে তা আরও একবার জানিয়ে দিল।
এই প্রাণ -প্রকৃতি- জীব বৈচিত্র্যকে যদি রক্ষা করা না যায়, কথিত উন্নয়নের সব প্রকল্পের জন্য মানুষ যদি প্রকৃতি বিনাশী তৎপরতা থেকে সরে না আসে তাহলে করোনার মত এরকম অদৃশ্য প্রাণঘাতি ভাইরাসে আগামীতে বহু মানুষ আক্রান্ত হবে। প্রকৃতির স্বাভাবিক ভারসাম্য যখন নষ্ট হয়, মাটি, পানি, বায়ু যখন বিষাক্ত হয়, হিমবাহ গলে সমুদ্রের উচ্চতা যখন বৃদ্ধি পায়, বাস্তুতন্ত্রের যখন পরিবর্তন ঘটতে থাকে তখন মানুষকে নানা বৈরী পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। প্রকৃতি স্বাভাবিক নিয়মের বাইরে মানুষ যখন উল্টা যাত্রা করে তখন অনিবার্যভাবে প্রকৃতি তার প্রতিশোধ নেয়। নানা অজানা ভাইরাস প্রকৃতির নানা প্রজাতি থেকে মানুষের দেহে আশ্রয় নেয়। সে কারণে করোনার মত ভাইরাসসমূহের মোকাবেলায় কেবল ঔষধ কোম্পানীগুলোর তৈরী করা নানা টিকা আর ভ্যাকসিনের দিকে তাকিয়ে থেকে এই ধরনের সংক্রমন থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে না। সে কারণে আমাদের নগরায়নসহ উন্নয়নের যাবতীয় ভাবনার দিক পরিবর্তন আজ একান্ত প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।
করোনা সংক্রমণ যখন মধ্যগগনে তখন ৩১ মে থেকে সরকার অনেকটা আকস্মিকভাবে যেভাবে সবকিছু চালু করার সিদ্ধান্ত নিল তা দেশের মানুষের কাছে এক মিশ্র প্রতিক্রিয়ার জন্ম দিয়েছে। একদিকে শিল্পপতি ও মালিকেরা সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানাচ্ছেন তাদের স্বার্থের দিকে তাকিয়ে, আর অন্যদিকে একে স্বল্প আয়ের গরীব ও শ্রমজীবী মেহনতি মানুষ এই দুঃসময়ে কাজ কর্ম করে বেঁচে থাকার সুযোগ হিসেবে দেখছে। করোনা মহামরী যে তাদের জীবনকে বিপন্ন করতে পারে সেসব চিন্তা তাদের কাছে এখনও গৌণ। দেখা যাচ্ছে সমাজের দুই অংশের মানুষ দুই কারণে এই ‘লকডাউন’ প্রত্যাহারের ঘোষণাকে স্বাগত জানাচ্ছে। এ এক অদ্ভুত পরিস্থিতি!
দেশের মহামারিকালে দুর্গত বিপুল সংখ্যক মানুষের দায়িত্ব নিতে না পারায় সরকার যে সবকিছু খুলে দিলো তা অত্যন্ত স্পষ্ট। সরকারের করোনা সম্পর্কিত কমিটি ৩/৪ সপ্তাহ যেখানে কঠোর লকডাউনের পক্ষে মতামত দিচ্ছেন সেখানে সংক্রমণের এই ভরা মৌসুমে সরকার দেশের মানুষকে যে এক বড় ধরনের ঝুঁকি ও বিপদের মধ্যে ঠেলে দিল তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। সরকারের নীতি যেন ‘যে যেভাবে পার বাঁচো’। এই ধরনের নীতি কৌশলে জনগণের প্রতি কোন দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়। জীবনের জন্য জীবিকা। কিন্তু জীবনকে বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দিয়ে জীবিকা চলতে পারে না। যেকোন গণতান্ত্রিক ও জনগণের প্রতি সংবেদনশীল সরকারকে মানুষের জীবনকে সবার উপরে স্থান দিতে হবে। করোনা দুর্যোগ মোকাবেলার ক্ষেত্রেও জীবকেই প্রধান হিসাবে বিবেচনা করতে হবে এবং সে আলোকেই করোনা দুর্যোগ পার হবার যাবতীয় নীতি কৌশল প্রণয়ন করতে হবে।
লেখক; সদস্য বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ারকারর্স পার্টির রাজনৈতিক পরিষদ।
