পরি,
ছিলো সে’দিন ঠিক এমনি ই এক সন্ধে!
গোধূলী’ পেরিয়ে যেতেই সূর্যের কিরণ টা যেন হলো পাগল পাড়া! দেখতে দেখতে ই গেলো সূর্যটা পাটে! দিনের সমাপ্তি ভেবে কৃষক শ্রমিক’ যে’ যার কাজ শেষে ফিরতে ঘরে হলো চঞ্চল ! কেউ বা তখনও যায় যাবো যাচ্ছি, ক্রমে নামছে অন্ধকার, অস্ত যাওয়া সূর্যের শেষ আলো টুকুনও গেলে নিভে, ধীরে দিনের শেষ অস্তিত্ব সেও গেলে’ মুছে ঢেকে ঘন আঁধারে ! ছিলো ডিসেম্বরের এক তারিখ ১৯৭১, হাঁড় কাপারো কনকনে ঠান্ডা শীত! অথচ নেই শীতের বাড়তি কাপড় গায়ে! সাঁতরে নদী পার হয়ে এলাম এপারে এক অচিন গ্রামে তিন চার হাত দূরেও যায় না দেখা কিছু’ ই! বিচ্ছিরি ঘুটঘুটে অন্ধকার !  না’ সাথে পরিবার, প্রত্যেকেই ছিলাম একা, তবু এক পরিবার ! ভিন্ন ভিন্ন গ্রাম শহর হতে আসা জনা সাতেক একই সাথে একপ্রাণ আমরা ছিলাম আমাদের সুখে দুখে ছিলাম যেন একে অন্যের প্রাণ, আপনের চেয়েও অতি আপনার, হয়ে পরিজন ! ছিলো না পথ চেনা, না’ ছিলো মৃত্যুভয়! তবে, ছিলো প্রতীক্ষা প্রতি’ মূহুর্ত আর প্রতি’ টি ক্ষণ কেবলই মৃত্যু’কে করতে আলিঙ্গন! সে সব  জেনে মেনে নিয়েই নেমেছি এই পথে !
অকুত ভয় মৃত্যুঞ্জয়ী ভেবে নিজেদের আমরা সাত জনই! মৃদু আলো আঁধারিতে চলতে পথে হঠাৎ ….দেখা, দেখে প্রথম হয়েছিল মনে হবে গ্রামেরই পাগল টাগল কেউ, তবুও কি’ ভেবে চাইলাম জানতে ঠিকানা ! নিরবে পথ দেখিয়ে দেবার ছলে চলেছিলে পাশাপাশি, প্রায় গা’ ঘেঁষে যেন দীর্ঘ চেনা অতি আপনার, নিঃশব্দে কিছু’ ক্ষণ কতক’ টা’ পথ একই সাথে তবে প্রত্যেকেই নিরব নির্বাক ! চলছি এগিয়ে পায়ে পায়ে অনেক টা’ পথ হারা পথিকের বেশে সাত জন, সাথে যোগ হলে তুমি!
বেশ কিছু’টা পথ যেতেই দাঁড়ালে থমকে, তখন নিশ্চিত, নিলাম বুঝে হবে গন্তব্যের অতি কাছে’! আশপাশে নিলে খুব সতর্কে দেখে! অচেনা তবু কেন জানি না কি’ ভেবে আকস্মাৎ কাঁধে রেখে একটি হাত দেখালে আমায় অন্য হাতে অন্ধকারের দিকে আঙুল তুলে! ঘন অন্ধকার তবু বললে দেখো চেয়ে, ঐ’ যে’ সামনে জঙ্গল ঠিক তার ওপাশে! রাস্তা থেকে নীচে নামলেই দেখবে জঙ্গলের ভিতর মাঝ খান দিয়ে কোণাকুনি পায়ে চলা পথ, যাবে না কিন্তু সে’ পথে ? ঐ পথে কুকুর’ রা যায় আসে, আবার পথের দু’ পাশে থাকে বসে রাতভর ঘাপটি মেরে ! তার একটু দূর দিয়ে যাবে খুব নিরবে তাহলে কেউই পাবে না’ দেখতে ! জঙ্গলের আড়াআড়ি দিয়ে সোজা খানিকটা গেলেই জঙ্গলের শেষ! তার একটু সামনে ছোট একটা খোলা মাঠ সেটা পার হয়ে গেলেই পাবে দেখা মস্ত টিনের দো’চালা বড় চার’ টি ঘর, আর ওটাই গন্তব্য খুঁজতে আসা তোমাদের  …..
বলতে বলতেই কাঁধে লুকেয়ে রাখা চাদরের আড়ালে এস এম জি’ র পেলে স্পর্শ আর তক্ষুণি আৎকে উঠে বলে চাপা স্বরে ফিসফিস করে, তুমি’ মানে তোমরা মুক্তি ? এ’ কথা কেন বলোনি আগে ? কি’ সর্বনাশ, এতো’ টা পথ আমার সাথে এই রাস্তা দিয়ে আসা হয় নি উচিৎ মোটেও তোমাদের !
প্রশ্ন করলাম কেন, হঠাৎ এমন কি’ হলো ? বলবে কি’ জলদি একটু খুলে ? তার উত্তরে শুধু বলেছিলে এখানে এভাবে দাঁড়িয়ে এখন কি’ গল্প কথার সময় ? যাও জঙ্গলের পথ ধরে লুকিয়ে পড়ো জলদি! শুনে বললাম বুঝলে কি’ করে আমরা যে’ …. কথা কেড়ে নিয়ে বললে বুঝলাম কি’ করে ? আমি একটি নারী ভাবতে কি পারো কতটা সাহসী আর হিংস্র হলে তবেই সে’ একা এমন অন্ধকারে একা পথ চলে ….? থাক সে’ সব, আমার নাম পরি, তবে নিজে রাখা মানে ছদ্ম, বিভিন্ন সময়ে ভিন্ন ভিন্ন নামে ভিন্ন ভিন্ন গ্রামে রাস্তায় গঞ্জের হাটে মাঠে ঘাটে বনে জঙ্গলে, দিনের বেলা ভিখারি কখনও প্রতিবন্ধি পাগলের বেশ ধরে রই ছদ্মবেশে, আর রাত এলেই হই ভয়ঙ্করী এক জ্যান্ত রাক্ষুসী ! দিনের আলোতে ক্যাম্পের আশ পাশে ঘুরঘুর করি দেখে নিয়ে সব কিছু মনের ভিতরে তার ছবি আঁকি, সুযোগ বুঝে পাতি রূপের ফাঁদ করি ইশারা, আর রাতের অন্ধকারে পাতা সেই ফাঁদে পাকি’দের ধরি ! রাতের আঁধারে কৌশলে নদীর ধারে কিম্বা জঙ্গলে নিয়ে শেষ করি ! যে’ দিন, যখন বুঝবো সময় শেষ এই বুঝি নিলো কেড়ে সম্ভ্রম পারলাম না রক্ষা করতে দেশ আর নিজেকে ঠিক, তক্ষুণি লুকিয়ে রাখা ছোট্ট একটি পিস্তল বের করে দেখিয়ে বললে দেখো ঠিক এমনি করে বলেই, চোখের পলকে ধরলে নিজ কপালে ঠেকিয়ে, আর দেবো ট্রিগার’ টা টিপে ! আমিও তোমাদেরই একজন! আসলে মানুষ হাসেবে নারী, কিন্তু বাস্তবে আমিও মুক্তি….আমি টিকটিকি! আর তাই সারাক্ষণ রাখে নজর ওরা আমার উপরে! ঐ’ হারামি গুলো, তারই মধ্যে একজন যাকে খুঁজছো সে এই গ্রামের চেয়ারম্যান! এক নম্বরের দালাল পাকি’দের! হারামি টা ক্যাপ্টেনের কথায় আর নিজের স্বার্থে, কতগুলো কুকুর কে দিয়েছে লেলিয়ে আমার পিছে ! সারাক্ষণ চায় রাখতে নজরে, চায় ধরতে!
তবে, আমিও….নাম পরি মূহুর্তে চোখের পলকে নিমেষে ই মিশি বাতাসে, ঠিক কর্পুরের মতন ! আর ঐ হারামি ক্যাপটেন, বলে কি-না সে’ যে’ আমাকে জ্যান্ত ধরে দিতে পারবে, দেবে তাকে হাজার টাকা বকশিস আর দেবে প্রথম রাত টা কাটাতে আমার সাথে! শুনে, আমিও বলি মনে-মনে আর হাসি! যদি হিম্মত থাকে তবে নিজে আয় না’ একা একবার দেখ এসে মন ভরে পরি’র রূপ, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি সাথে সাহসের ঝলক আর পরি’র চোখের যাদু !
তবে, দুঃখ কি’ জানো হারামি’ টাকে কিছুতেই পাচ্ছি না নাগালে, আর না পারছি আনতে বাগে !দিন রাত থাকে ক্যাম্পের ভিতরে ই! হারামি’ টা আসেই না বাইরে! আমিও দেখবো কত দিন থাকিস ক্যাম্পের ভিতরে লুকিয়ে, ভীতুর ডিম একটা এসেছে যুদ্ধ করতে, যা ফিরে, ফিরে গিয়ে লুকিয়ে থাক বউ এর আঁচলে মুখ ঢেকে ! বলতে পারো এখন আমার একটাই কাজ কিম্বা শেষ ইচ্ছা ঐ দুই টা হারামিই নিশানা’ আমার আর আমি ওদের ! ওরা ধরবে আমাকে হেহ্,  আমাকে ধরা এতই…. আর একটাও কথা নয়, অন্ধকারে যাও মিশে যে’ যার কাজে নিজ পথে! যদি বেঁচে থাকি তবে, হয়ত আবারও হবে দেখা, নয় তো না আর কোনো দিনও ……বলেই বাড়িয়ে দিলে হাত মেলাতে হাতে, হাতটা ধরে বললে বলো ফের একবার চাপা কিন্তু আত্ম প্রত্যয়ে দৃঢ়তার সাথে, বলবে হৃৎপিন্ডের স্পন্দন হতে, বলো প্রয়োজনে যদি মরতেই হয় তবে মৃত্যুর আগে এই দেশটাকে স্বাধীন করে তবেই মরবো! নয় তার আগে, বলো ঝলসে উঠবো প্রতিবার ভিন্ন ভাবে হোক’ সে’ শেষ বার! লক্ষ্য এখন আমাদের একটাই, পাকি’ দের কবল হতে আনবোই আনবো ছিনিয়ে স্বীধীনতার লাল সূর্য টাকে! যেও কিন্তু সাবধানে আর থেকো সতর্ক সদা আমি এদিক’ টা দেখি, খোদা হাফেজ, আল বিদা …..অন্ধকারে যাচ্ছে না দেখা কিছু’ ই ভালো করে, কোনো রকমে রাস্তা থেকে সাবধানে নীচে নামছি হাঁটছি আর ভাবছি, উুফফ কি ভয়ঙ্কর আর তেজস্বিনী যেন সাক্ষাৎ প্রকৃত বাংলার বাঘিনী! পেলাম স্পর্শ যার সে এক বীর’ সাহসী নারী’ অকৃত্তিম উষ্ণ শীতল স্পর্শ, সে’ পরি’ র !
যে’ স্বেচ্ছায় করেছে উৎসর্গ নিজেকে এই দেশের মুক্তি’ র, পেলাম উদ্দাম যেন’ নতুন করে! বাড়লো আরও সাহস বাড়লো দৃঢ়তা বহু গুন অনেক মনে ! তবে, রইল না সে’ স্পর্শ থমকে কেবলই হাতে!  বিদ্যুৎ বেগে মূহুর্তে পৌঁছে গেলো হৃৎপিন্ডে, রক্তে মিশে ধীরে ধ্বমণী হয়ে শিরা উপশিরায় ছড়ালো তা’ অস্তিত্বে ! হলাম যেন’ ক্ষণিকের তরে ক্ষণেক বিবশ …..পরক্ষণে পেলাম স্পৃহা নতুন করে, তা বেড়ে হলো লক্ষ গুন ! তবে, সে’দিন হয়নি দেখা একবারও স্পষ্ট তেজস্বিনী ওমুখ পরি’র, ঘুটঘুটে ঐ অন্ধকারে! না দেখা তার পর আর কোনো দিন ! কেবলই কথা গুলো বারবার এখনো কানে বাজে দৃঢ় প্রত্যয় আর চাপা ক্ষোভ সাথে বলিষ্ঠ কন্ঠস্বর, এক বীর’ মুক্তি’ কামি নারী’ মুক্তি
যোদ্ধা’ র ! যার বিরল সাহসীকতা আর নিঃস্বার্থ আত্মত্যাগে আজ আমরা স্বাধীন এক ভূমির উপরে.দাঁড়িয়ে ! মধুমতি নদ হলাম পার! দিনে থাকি লুকিয়ে বন জঙ্গলে অপেক্ষা’ রাতের ! ছিলো সঙ্গী দেখাতে পথ কেবলই জোনাকী ‘র আলো! ওরাই নিয়ে যেত দেখিয়ে পথ! শেষে একদিন গড়াই পাড় হয়ে এলাম এপারে!
জীবনে এই প্রথম, তের টা দিন পায়ে হেঁটে! ছিলো না অভ্যেস কখনই আগে! প্রথম ক’দিন ভীষণ কষ্ট হত ! তবে, পরে ধীরে গিয়েছিলো সয়ে! কতদিন যে’ কেটেছে ভাত না’ খেয়ে মনে নেই! কোনো কোনো দিন এক কিম্বা দুই মুঠ শুকনো মুড়ি চিরে সেও চলতি পথে, কোনো কোনো দিন আবার কিছুই না খেয়ে শুধুই পানি খেয়ে! নেই পথ চেনা না জানা শোনা! কোথাও কেউ অন্ধকারে দেখলে অচেনা মুখ বিশ্বাস অবিশ্বাসে করে হাজার প্রশ্ন অথচ সে’দিন, হঠাৎ পেলাম দেখা একমাত্র তোমার দিলে দেখিয়ে পথ বিনা প্রশ্নে বাক্য অপচয়ে!
মিলে সাত জনে সে’ রাতেই প্রথমে চেয়ারম্যান তার কাছ থেকে জেনে নিয়ে দিলাম ওকে আর চ্যালা যে’ ক’ জন ছিলো সাথে একে একে সব গুলোকে পাঠিয়ে উপরে ! তার পর গেলাম একত্রে এগিয়ে ক্যাম্প টাকে নিশ্চিহ্ন করতে !  পাকা খবর নিয়েছি আগেই জেনে ক্যাম্পে সব মিলিয়ে ওরা সাড়ে তিন শ’ ! তবে, ছিলো উপস্থিত তখন শ’ দু’ য়েক বাকী’ রা অপারেশনে! ঘটনার পর ওরা ফেরেনি আর ভয়ে ক্যাম্পে ! প্রথমে লক্ষ্যহীন একটি গুলি ক্যাম্পের টিনের চালে, চিৎকার করে এলো বেরিয়ে দু’ জন, জ্বলন্ত সিগারেট নিয়ে মুখে ! কন, কন হে উধার এবার আরেক টি গুলি ঠিক একটার বুকের একটু নীচে বললো চিৎকারে কাহা হো সব আও ইধার জলদি …দেখো মুক্তি নজদিক ইধার ক্যাম্প ঘিরলিয়া , মুক্তি এ্যাটাক কিয়া….
হামকো মারডা লা রে …অন্য টা টু শব্দও করার পেলো না সময় পড়লো লুটিয়ে! ভিতরে যারা ছিলে শুয়ে বসে কেউ ঘুমিয়ে চিৎকার শুনে দিশেহারা হয়ে এলো বেড়িয়ে, ঠিকঠাক কিছু’ বুঝে উঠার আগেই অতর্কিত ভাবে এলো পাথারে গুলি আর গ্রেনেট চার্জ একের পর এক আর সমূলে গর্জে চলেছে ষ্টেইন, এল এম জি আর এস এম জি’ র মুখ থেকে অনর্গল গুলি বর্ষণে উড়ে গেলো কতক, বাকী রা পড়লো লুটিয়ে! ততক্ষণে আশ পাশে লুকিয়ে থাকা বাকী দালালেরা বুঝে ফেলেছে নিশ্চয়ই এমন ভয়ঙ্কর গুলি আর গ্রেনেটের শব্দে, ক্যাম্প আক্রমন হয়েছে চলছে অবিরাম গোলা গুলি পাল্টা আক্রমন সামথিং রং ! দ্রুত সরতে হবে এখান থেকে তবে, একত্রে নয় আলাদা ভাবে ভিন্ন পথে ! পরবর্তীতে কোথায় মিলবো সেই গোপন স্থান সবারই আছে জানা !
সাত জনের দু’ জন হলো শহীদ, একজন আমার কাঁধে ! বাকী চার জনকে পাঠালাম আরেক জন শহীদ সহযোদ্ধা কে দিয়ে অন্য পথে ! কিছু দূর যেতেই দেশী তিন দালাল এসে ধরে ফেললো আমাকে! এক মূহুর্ত নিজেরা ইঙ্গিতে কি যেন বলে নিয়ে চললো নদীর দিকে, একজন বললো দে’ এখানেই, আরেক জন, না’ এখানে না’, নদীর ধারে গিয়ে ! নদী থেকে একটু দূরে দু’ জন দাঁড়িয়ে গেলে অন্য জন আমার পিছে তার নির্দেশ মত চলছি নেই হাতে একটুও সময় ভাবছি দ্রুত! গুলি করবে বাকী দু’ জন সেখানেই দূরে রইল পাহারাতে! জানি, গুলি মানে মৃত্যু নিশ্চিত এক্ষুণি, অতি দ্রুত ঠিক করি ওকে নিয়েই… এমন সময় সে দাড়িয়ে বললো জোরে হাট বুঝলাম আরেকটু সামনে গেলেই….  মূহুর্তে ঘুরে অতর্কিতে বাঘের মত পড়লাম ঝাঁপিয়ে ধস্তাধস্তিতে দূরে থাকা দু’ জনের একজন গুলি করলে লাগলো আমার পায়ে উুড়ুর নীচে ! সে’ দিকে খেয়াল না’ করে কাছের  কুত্তা টাকে নিয়েই দিলাম ঝাঁপ নদীতে! দ্রুত পানির নীচে গভীরে টেনে নিয়ে দিলাম ঘার মটকে! ওকে ছেড়ে দিয়ে গেলাম ভেসে ডুব সাঁতারে অনেক দূরে! রক্তে পানি লালে লাল হচ্ছে জানি! প্রচন্ড ঠান্ডা পানিতে খানিকটা যেতেই দেহ অবসাদে অসার ঠেকলো বুঝলাম সময় শেষ হয়ে গেছে, হয়েছে অনেক রক্ত ক্ষরণ!  তবুও চলছি ভেসে ডুব সাঁতারে যতটা সম্ভব চাই যেতে নাগালের বাইরে ! এমনি কিছু পরে যেন আর পারিনে, পা’ ঠেকিয়ে পেলাম মাটি পায়ের নীচে! কোনো মতে কিনারে! তার পর আর কিছুই নেই মনে …..
ঠিক কোথায় তাও জানিনে, যেদিক তাকায় অন্ধকার আর অন্ধকার —-
যখন জ্ঞান ফিরলো, দেখি শরীরের অর্ধেক টা অদ্ভূত ধবধবে সাদা একটা চাদরে ঢাকা ! আশ পাশে কেউ নেই, পিঠ টা অবশ ! মনে হচ্ছিল অনেক দিন যাবৎ হয়ত একই ভাবে আছি শুয়ে ! ভাবলাম উঠে একটু বসলে মন্দ হতো না! তবে উঠতি গিয়ে উঠতে পারলাম আর মাথা টা যত টুকুন তুলেছিলাম চোখ’ পড়তেই মনে হলো ডান পা’ টা হাঁটুর’ পরে নেই, বুকের ভিতরে ধক করে একটা ধাক্কা খেলাম!
কি জানি কেন মনে হলো এমন ? ভাবছি দূর্বল শরীর হবে মনের ভুল, আরেক বার উঠতে চেষ্টা করতে ই একজন দৌড়ে এসে আরে কি করছেন একদম উঠবেন না নড়াচড়া করলেই আবার রক্ত ঝড়বে ! জিজ্ঞাসু চোখে’ তাকাতেই উনি বললেন দুঃখিত ডাক্তার অনেক ভাবে অনেক রকম ভেবেছেন চেষ্টাও…..কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর …..আর, কি আর থামলেন কেন বলুন বলুন না….? আপনি একটু শান্ত হোন আমি বলছি! হ্যাঁ আমি ডাক্তার তবে ব্যার্থ ডাক্তার বলতে পারেন, অনেক চেষ্টা করেও কিছু’ তেই পারলাম না আপনার পা’ টাকে রাখতে কারণ অল রেডি ইনফেকশন শুরু হয়ে গিয়েছিলো তবুও তার পরেও আমি এক সপ্তাহ অপেক্ষা করেছি সাধ্যমত চেষ্টাও করেছি কিন্তু শেষ অবধি……কেটে ফেলতে বাধ্য হলাম সেও শুধু আপনাকে বাঁচিয়ে রাখতে !
তার মানে ….হ্যাঁ তার মানে নেই ?
অর্ধেকটা ! স্থির আছি চেয়ে দূরে ঐ জানালা গলে যত দূর যায় দৃষ্টি ! সে ভাবেই আছি শুয়ে, শুধু ভাবছি আর ভাবছি পা’ নেই ? স্থির যেন পাথর দৃষ্টি ভিতর টা কুঁকড়ে যাচ্ছে অনেক কষ্টে একটু হাসতে চেষ্টা করে বললাম অনেক ধন্যবাদ আপনাকে ! বলতেই চোখের কোণে বেয়ে মনে হলো এলো গড়িয়ে পড়লো খানিক জলের ধারা! আরে এ’ কি  ছিঃ এমন বীরের চোখে অশ্রু জল সে কি মানায় বলেন? আচ্ছা তবে যুদ্ধ দেশ আর স্বাধীনতা আমাদের ?  তবে কি আমরা …. কেউ একজন এসে প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত সৈনিক কায়দায় স্যালুট করে বললো, দুঃখ করোনা, একটা পা’র অর্ধেক হারিয়েছো মাত্র ! তবে, আছো এখনও বেঁচে করো শুকরিয়া আদায়!  অর্ধেক পা’ র বদলে দিয়েছো স্বাধীন দেশ এই জাতিকে! বলো এও ক’ জন পেরেছে ? শুনে গর্বে ভরে উঠলো বুক! মনে-মনে নিরবে বললাম আলহামদুলিল্লাহ্… গেলো আরও কিছু দিন, আরও একটু সুস্থ হয়ে সিদ্ধান্ত নিই মনে, উঠে দাঁড়ায় ক্রাচে ভর দিয়ে …..
খোঁজ নিতে হবে পরি’ র, খুঁজে বের করতে হবে রতন, মাহমুদ, নিজাম, আজগার যাকে যাকে পাই! খুঁজি আর করি অপেক্ষা’ তোমাদের’ জন্য বাধি বুক স্বপ্নে, অপেক্ষা’ ফিরে পেতে ……আজও তোমার আর তোমাদের ……জানো, অপেক্ষা’ কেবলই যাই যাবো করেও করি অপেক্ষা’ মনে হয়  না’ হয় আর কিছুক্ষণ, যাক মুছে অস্তমিত সূর্যের শেষ আলো টুকুন ঐ পশ্চিমাকাশে! ভাবি হোক ক্ষীণ হতে হতে শেষে অস্পষ্ট না হয় যতক্ষণ দৃষ্টিতে সবই ! তবু ভাবি, না’ হয় থাকি আরেকটু ক্ষণ, মনে হয় চলে যাবো, চলে গেলেই যদি আসো ফিরে আমার খোঁজে ? আর এসে যদি না পাও তবে  …..জানি’ কষ্ট পাবে ভীষণ ! তবে, করি না’ হয় আরও একটু ক্ষণ .. যাবো না হয় আর একটু পরে, তারও অনেক পরে যাই যাই করে করেও হয় না যাওয়া আর ফিরে ঘরে ! রই বসে আরও কতক্ষণ কে’ জানে তেমনি করেই  ! এমনি করে কাটে কত কত ক্ষণ, যায় দিন আসে সপ্তাহ ঘুরে মাস বছর পেরিয়ে আসে যুগ সেও একদিন যায় পেরিয়ে ……স্বাধীনতা’ র পর থেকে আজ দীর্ঘ আট চল্লিশ বছর ধরে এখনও খুঁজে ফিরি, খুঁজি বেলা ডুবে গেলে গ্রাম গঞ্জে মাঠে ঘাটে শহরে আজও খুঁজে ফিরি খুঁজি ছদ্মনাম নিয়ে ছদ্মবেশী এক নারী যোদ্ধা’ কে ! এক মুক্তি’ টিকটিকি যাকে পেয়েছিলাম ক্ষণিক সময় সহযোদ্ধা স্বরূপ নিকষ এক অন্ধকার রাতে!  পেয়েছিলাম সে’দিন অনুভবে অকৃত্তিম সাহসী এক বীর নারী যেদ্ধার উষ্ণ শীতল স্পর্শ, যার নাম বলেছিলো অন্ধকারে আছে স্পষ্ট মনে আছে আজও দাগ কেটে মনে …. হ্যাঁ সেই পরি’ কে …

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।